Barrister Sumon

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সেজান জুসের কারখানায় আগুনে পুড়ে ৫২ জন নিহত হওয়ার ঘটনা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন ফেসবুক লাইভে এসে কথা বলেছেন।

তিনি বলেন, ‘মানুষ আগুনে পুড়ে মরতেই পারে, পৃথিবী জুড়ে এমন ঘটনা হয়। কিন্তু যখন অভিযোগ শোনা যায় গেট লাগিয়ে রাখার কারণে বা ছাদে না উঠতে পারার কারণে এতগুলো মানুষ মারা গেছেন। তখন কি আপনার মনে হয় এটা শুধুই অ্যাক্সিডেন্ট?’

কারখানায় আগুনে পুড়ে মারা যাওয়ার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করে কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ ও নিহতদের পরিবারকে কমপক্ষে দুই লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। এছাড়া কোম্পানির পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্টদের প্রতি তাগিদ জানান তিনি।

শনিবার (১০ জুলাই) ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে থেকে ফেসবুক লাইভে এসে ব্যারিস্টার সুমন এমন আহ্বান জানান।

ব্যারিস্টার সুমন বলেন, ‘রূপগঞ্জে সেজান জুস তৈরি করা হয়। হাসেম গ্রুপ এই সেজান জুস বানায়। এই সেজান বানাতে গিয়েই অর্ধশতাধিক মানুষ পুড়ে কয়লা হয়ে গেল। আমি যেখানে দাঁড়িয়ে তার পাশেই অনেকগুলো লাশ পড়ে আছে। সবগুলো পুড়ে একেবারে কয়লা হয়ে গেছে। আমি আপনাদের একটি জিনিস বলতে চাই, বাংলাদেশের মানুষ আগুনে পুড়ে মরতেই পারে। এটা সারা পৃথিবীতেই হয়। কিন্তু যখন অভিযোগ শোনা যায় গেট লাগিয়ে রাখার কারণে বা ছাদে না উঠতে পারার কারণে এতগুলো মানুষ মারা গেছেন। তখন কি আপনার মনে হয় এটা শুধুই অ্যাক্সিডেন্ট?’

তিনি বলেন, ‘আর একটা জিনিস খেয়াল করেন, আমাদের দেশে লেবার ল বা শ্রম আইন আছে। এই শ্রম আইন অনুযায়ী ৫২ জন যদি মারা গিয়ে থাকেন, তাহলে সর্বোচ্চ জনপ্রতি ২ লাখ টাকা দিতে হবে। দুই লাখ টাকা করে মোট ১ কোটি ৪ টাকা দিলেই মালিক হাসেম সাহেবের সব ঝামেলা শেষ। তাহলে ১ কোটি ৪ লাখ টাকা কি এই ৫২ জনের জীবনের দাম? ৫২ জন অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেলে ক্ষতিপূরণের মামলা হতে পারে। কিন্তু তাকে যদি হত্যায় সহযোগিতা করা হয়, এই গেট লাগিয়ে রাখার কারণে, গেট লাগিয়ে রেখে যদি মরতে বাধ্য করেন তাহলে অ্যাক্সিডেন্টের মামলা হওয়ার কথা নয়। আমাদের প্যানাল কোডের ৩০৪/২ ধারা অনুযায়ী এ ধরনের ডেসপারেট আচরণের কারণে যাবজ্জীবন পর্যন্ত সাজার ব্যবস্থা আছে।’

‘আমি বলছি না যে বিজনেস করতে গেলে আগুন লাগবে না, আগুন লাগবে, আগুনে মানুষ মরতেই পারে। আমাদের মতো দেশে এভাবে হাজার হাজার মানুষ মারা যায়, কিন্তু আপনার আচরণের কারণে, এই গেটটা লাগিয়ে রাখার কারণে যদি মারা যায়। আমরা বলতে পারি এই মানুষগুলোর জীবনের কোনো দাম নেই আপনার কাছে। আমি শুনেছি, এই সেজান জুস নাকি পাকিস্তানি প্রডাক্ট। পাকিস্তান একাত্তর সালে যন্ত্রণা দিয়েছে, এখনও যন্ত্রণা দিচ্ছে। একটা পজিটিভ দিক এই প্রডাক্ট নাকি খারাপ না। কিন্তু বুঝতে পেরেছেন কতগুলো ঘাম আর রক্তের মধ্যে দিয়ে এই প্রডাক্ট বাংলাদেশে এসেছে’, বলেন ব্যারিস্টার সুমন।

ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্যে ব্যারিস্টার সুমন বলেন, ‘ব্যবসা করবেন ঠিক আছে। কিন্তু মানুষকে হত্যার দিকে ঠেলে দেবেন না। মানুষ হত্যার মধ্যে দিয়ে টাকা ইনকাম করতে পারেন না। এ বিষয়ে সরকারের অনেক কিছু করার আছে। এর আগে তাজরিন ফ্যাশনে ১১১ জন পুড়ে ছাই হয়ে গেল, বিচারের তো কিছু দেখা গেল না। সরকারের প্রতি আমার আহ্বান থাকবে ভালো করে একটি কমিটি করুন। যারা মারা গেছেন তারা এই দুই লাখ করে টাকা পাবেন কি-না তাও জানি না। কারণ শ্রমিকরা তো সংঘবদ্ধ না। কিন্তু ব্যবসায়ীরা অনেক বেশি সংঘবদ্ধ। এদের থেকে দুই লাখ করে আনাই তো কষ্টকর।’

সুপ্রিম কোর্টের এই আইনজীবী বলেন, ‘সরকারকে আমি বলব, যদি গেট তালাবদ্ধ থাকার কারণেই শ্রমিক মারা যায়, তাহলে কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগ আনুন। সরকার থেকে এবং কোম্পানি থেকে নিহতদের পরিবার ক্ষতিপূরণ পায়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। মানুষগুলোকে তো ফেরানো যাবে না, অন্তত তাদের আত্মা যেন শান্তি পায়, এই প্রার্থনা করছি।’

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সজীব গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান হাসেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজের সেজান জুস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে এখন পর্যন্ত ৫২ শ্রমিকের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে ফায়ার সার্ভিস। অধিকাংশ মরদেহই ভবনটির দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ তলা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

এর পরে ওই ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় আট জনকে গ্রেফতারের পর তাদেরকে আদালতে তোলা হয়। শনিবার বিকেলে নারায়ণগঞ্জ আদালত ওই আটজনের চারদিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। যদিও পুলিশ তাদেরকে ১০ দিন করে রিমান্ড নেয়ার আবেদন জানিয়েছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *