দেশে কার্যরত সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলো প্রায় নিজেদের উদ্যোগেই রেমিট্যান্স আসার পথ অনেক সহজ করেছে। তারা এ জন্য বিদেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিও করেছে। কোনো কোনো ব্যাংক আবার বিভিন্ন সময় কর্মী পাঠিয়ে প্রবাসী আয় সংগ্রহ করেছে। বাংলাদেশি প্রবাসী-অধ্যুষিত অঞ্চলে ইসলামী ব্যাংকসহ কিছু ব্যাংকের বিদেশে নিজ নামে শাখা-উপশাখাও রয়েছে। প্রবাসী আয় বিতরণে এখন ব্যাংক শাখার পাশাপাশি এজেন্ট ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং ও বেসরকারি সংস্থাও কাজ করছে। ফলে বিদেশ থেকে পাঠানো রেমিট্যান্স দ্রুততম সময়ে সরাসরি চলে যাচ্ছে প্রবাসীদের স্বজনদের কাছে। এটি আবার সরকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নীতির ও একটি বিরাট লক্ষ্য।

করোনাভাইরাসের ধাক্কায় বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশের অর্থনীতি কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু এ খারাপ সময়েও অর্থনীতিতে সুবাতাস ছড়িয়েছে প্রবাসী আয়। খারাপ সময়েও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স কমেনি, বরং বেড়েছে। বিদায়ী ২০২০-২১ অর্থবছরে আগের বছরের চেয়ে ৩৬ শতাংশ বেশি অর্থ পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। যদিও করোনার কারণে কয়েক লাখ প্রবাসী শ্রমিক কাজ হারিয়ে দেশে ফিরে এসেছেন। যাঁরা প্রবাসে আছেন, তাঁদেরও আয় কমে গেছে। তারপরও বিদায়ী অর্থবছরে ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসী আয়ে অনেকটা যেন জোয়ার ছিল।

অনেক প্রবাসীরা পত্রিকান্তরে বলেছেন, আগে টাকা পাঠাতে অনেক দূরে যেতে হতো। এখন আশপাশের বিভিন্ন এক্সচেঞ্জ হাউস থেকেই টাকা পাঠানো যায়। এ জন্য প্রতি মাসেই তাঁরা এখন টাকা পাঠান। পরিবারের সদস্যরা বাড়ির পাশের এজেন্ট ব্যাংকিং থেকে টাকা পেয়ে যাচ্ছেন। তবে প্রবাসী শ্রমিকেরা যেন দেশে ফিরতে বা বিদেশে যাওয়ার সময় বিমানবন্দর বা কোথাও হয়রানির শিকার না হন, এদিকে সরকারের নজর চান তাঁরা।

বিদায়ী অর্থবছরে দেশে সব মিলিয়ে প্রবাসী আয় এসেছে ২ হাজার ৪৭৭ কোটি ৭৭ লাখ ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা (প্রতি ডলার ৮৫ টাকা ধরে)। এই আয় এর আগের ২০১৯-২০ অর্থবছরের ১ হাজার ৮০৩ কোটি ১০ লাখ ডলারের চেয়ে ৩৬ শতাংশ বেশি এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছরের তুলনায় দ্বিগুণ। এদিকে বিদায়ী অর্থবছরে পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে মোট আয় হয়েছে ৩ হাজার ৮৭৬ কোটি ডলার। অর্থাৎ, প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো অর্থ রপ্তানি আয়ের অনেকটা কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে।

করোনার মধ্যে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে বড় স্বস্তি এনে দিয়েছে। এই কারণে দেশের ব্যাংকগুলোতে আমানত বেড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি পাচ্ছে। গ্রামীণ জনপদে থাকা প্রবাসীদের স্বজনেরা করোনার আর্থিক প্রভাব থেকেও রেহাই পাচ্ছেন।

আগেই বলেছি, রপ্তানি আয়ের পাশাপাশি প্রবাসী আয় বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বা মজুত নতুন উচ্চতায় উঠেছে। ১৫ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংকে রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৪৫ দশমিক ৩৮ বিলিয়ন বা ৪ হাজার ৫৩৮ কোটি ডলার। এর আগে গত মে মাসের শুরুতে রিজার্ভ ৪৫ বিলিয়ন বা ৪ হাজার ৫০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছিল। আকু (এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়ন) পেমেন্টের আগে এক দিন ৪৬ বিলিয়ন ডলারও ছাড়িয়েছিল।

২০১৯-২০ অর্থবছরে সরকার দেশে প্রবাসী আয় পাঠানোর বিপরীতে ২ শতাংশ প্রণোদনা ঘোষণা করে। অনেকটা এই কারণে বৈধ পথে প্রবাসী আয় বাড়তে শুরু করে। করোনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে রেমিট্যান্স আসাও হঠাৎ বেড়ে গেছে। আর কমেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আসা রেমিট্যান্সের পরিমাণ। ২০১৮-১৯ সাল পর্যন্ত রেমিট্যান্স পাঠানো শীর্ষ দেশের মধ্যে সৌদি আরবের পর ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত। ২০১৯-২০ সাল থেকে সৌদি আরবের পরই রেমিট্যান্স বেশি আসছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে।

করোনার মধ্যে গত ২০২০ সালে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রবাসী আয় বেড়েছে ৫ দশমিক ২ শতাংশ। করোনার মধ্যে কেন দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় প্রবাসী আয় বেড়েছে, তা নিয়ে ১৩ জুলাই একটি মতামত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক। সেখানে প্রবাসী আয় বৃদ্ধির ছয়টি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। কারণগুলো হলো প্রবাসীদের সঞ্চয় দেশে পাঠানোর প্রবণতা বৃদ্ধি, বৈধ পথে দেশে প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বৃদ্ধি, দেশে থাকা পরিবারের প্রতি সহানুভূতিশীলতা, অর্থ প্রেরণের নতুন নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবন, কর ছাড় ও বড় দেশের প্রণোদনার অর্থের কিছু অংশও আসা।

ইতিমধ্যেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, প্রবাসী আয় দক্ষিণ এশিয়ার গরিব পরিবারগুলোর দারিদ্র্যসীমার ওপরে ওঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। উল্লিখিত বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে: ১. করোনার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে প্রবাসী শ্রমিকদের কাজের সুযোগ কমেছে। ফলে প্রবাসে বহু শ্রমিক চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরে এসেছেন। তাঁরা পাততাড়ি গুটিয়ে নিজেদের সঞ্চয় দেশে নিয়ে এসেছেন। ২. তা ছাড়া করোনাকালে বৈধ উপায়ে প্রবাসীরা বেশি অর্থ পাঠিয়েছেন। ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণে অনেক প্রবাসী শ্রমিক দেশে ফিরতে পারেননি। এতে বন্ধুবান্ধবের মাধ্যমে দেশে অর্থ প্রেরণের সুযোগও কমে যায়। তাই বৈধ উপায়ে দেশে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা বেড়েছে। ৩. করোনার সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার প্রবাসী শ্রমিকদের দেশে থাকা পরিবারগুলো নানা সমস্যায় পড়েছে। তাই পরিবারের রুগ্‌ণ বা কাজ বঞ্চিতদের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে তাঁরা দেশে আগের চেয়ে বেশি অর্থ পাঠিয়েছেন। ৪. প্রবাসী আয় দেশে পাঠানোর ক্ষেত্রে প্রতিনিয়তই নতুন নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবিত হচ্ছে। নানা ধরনের আর্থিক চ্যানেল তৈরি হয়েছে। জিপে ও আলিপের মতো অর্থ প্রেরণের অ্যাপস এসেছে। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে প্রবাসী আয় পাঠানো সহজ হয়েছে। এ ক্ষেত্রে আমাদের দেশের মোবাইল অর্থ সেবা এবং এজেন্ট ব্যাংকও ভূমিকা রেখেছে। ৫. কর ছাড় বা আর্থিক প্রণোদনা দিয়ে বৈধ চ্যানেলে প্রবাসী আয় পাঠানোকে উৎসাহিত করেছে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো। এ ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে বৈধ চ্যানেলে প্রবাসী আয় পাঠালে ২ শতাংশ হারে প্রণোদনা দেওয়া হয়। অধিকন্তু কিছু কিছু ব্যাংকও বেশ কিছু প্রণোদনা দিচ্ছে। ৬. করোনাকালে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলো নানা ধরনের আর্থিক প্রণোদনা দিয়েছে। সেই প্রণোদনার অর্থের কিছুটা অংশ দক্ষিণ এশিয়ার প্রবাসী শ্রমিকেরাও পেয়েছেন। সেটা অনেকেই দেশে নিজেদের পরিবারের কাছে পাঠিয়েছেন।

করোনা পরবর্তীকালে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার শুরু হলে এবং বাংলাদেশি প্রবাসী-অধ্যুষিত দেশগুলোতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পেলে রেমিট্যান্সের এই ধারা অব্যাহত থাকবে বলেই অনেকে মনে করেন। তথাপি বৈধ চ্যানেলে অর্থ আনয়নের প্রণোদনা, বিদেশে শ্রমিক পাঠানো বৃদ্ধি পাওয়া এবং প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তাও এ ক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা রাখবে, এমনকি চ্যালেঞ্জ হিসেবেও আবির্ভূত হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *